পাতা

প্রকল্প

শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি প্রকল্প, প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন কর্মসূচী-৩

 

        উন্নয়ন প্রকল্পের গাইডলাইন মেনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাস্তবায়িত দ্বিতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচী চলতি বছরের জুন মাসে শেষ হয়েছে। এ কর্মসূচীর ধারাবাহিকতায় তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচী প্রস্তাব করা হয়েছে। ২২ হাজার ১৯৭ কোটি টাকার তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পসহ ৪টি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভা (একনেক)… এগুলো বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে ২৩ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ১৯ হাজার ১৮১ কোটি টাকা এবং প্রকল্প সাহায্য থেকে ৪ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে।একনেকে অনুমোদন হওয়া ব্যাপক আলোচিত তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প সম্পর্কে জানা গেছে, দেশের প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নে ৫ বছরে ২২ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা ব্যয় করার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিলের ১৮ হাজার ৮০৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার অনুদান রয়েছে ৩ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা। তৃতীয় শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচী (পিইডিপি-৩) শীর্ষক অনুমোদন এ প্রকল্পের মাধ্যমে এ অর্থ ব্যয় হবে। এটি বাস্তবায়ন হলে:

- প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী সকল ছেলে মেয়েকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো এবং ৫ বছর মেয়াদী প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব হবে

-প্রাথমিক শিক্ষার শ্রেণীভিত্তিক ও বিষয়ভিত্তিক নির্ধারিত শিখনকাল এবং যোগ্যতা অর্জনের ব্যবস্থাকরণ

- শিখন ও শেখানোর গুনগতমানের উন্নয়ন, সকল শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ প্রদান

- প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা

- চাহিদাভিত্তিক অবকাঠামো উন্নয়নের ব্যবস্থা করা এবং

- প্রাথমিক শিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত বাজেটের সংস্থান রাখা যাবে।

প্রকল্পের আওতায় মূল কার্যক্রম হচ্ছে:

জনবলের বেতন ভাতা, নতুন শিক্ষক নিয়োগ, নতুন বিদ্যালয় নির্মাণ, নতুন শ্রেণীকক্ষ নির্মাণ ও পুরাতন শ্রেণী কক্ষ সংস্কার, টয়লেট নির্মাণ, নলকূপ স্থাপন, আসবাবপত্র সরবরাহ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ, উপবৃত্তি প্রদান, স্কুল ফিডিং কার্যক্রম পরিচালনা, ইমারজেন্সী এডুকেশন, শিশু স্বাস্থ্য, সামাজিক উদ্ধুদ্ধকরণ, ঝরে পড়া শিক্ষাথর্ীদের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদান, একীভূত শিক্ষা, কারিকুলাম উন্নয়ন, বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা উপকরণ ও সামগ্রী সরবরাহ , সমাপনী পরীক্ষা পরিচালনা, স্টাডি, শিশু জরিপ, বিদ্যালয় জরিপ, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা এবং পরামর্শক নিয়োগ করা হবে।

 

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বৈদেশিক অর্থায়ন সম্পর্কে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডিসূত্রে জানা গেছে,

এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রকল্প সাহায্য দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইইউ, ডিএফআইডি, সুইডিস সিডা, কানাডিয়ান সিডা, জাইকা, ইউনিসেফ ও অস-এইড। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর মধ্যে গত ২৬ মে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে এবং ৩০ মে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে ঋণ চুক্তির বিষয়ে নেগোসিয়েশন হয়েছে। বর্তমানে ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অন্যান্য সংস্থাগুলোর কাছ থেকে আশ্বাস পাওয়া গেছে।

ব্যাপক বৈদেশিক সহায়তার কথা বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত দাতাদের যৌথভাবে চাপিয়ে দেয়া ট্রেজারি মডেলের আওতায় এ প্রকল্পটি গত ২ আগস্ট অনুমোদন দিয়েছে একনেক। প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ঐ সভায় পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য যে সুপারিশ দিয়েছেন তাতে বলা হয়েছে নতুন এ ধারণা চালুর আগে বাংলাদেশে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখা দরকার। এই মডেল অনুসরণ করলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থছাড় ও অর্থব্যয় দুদিক থেকেই দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেবে। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সৃষ্টি হবে বিশৃঙ্খলার। তাছাড়া এ প্রকল্পটি প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে উন্নয়ন প্রকল্প ছকে প্রস্তাব করা হলেও উন্নয়ন প্রকল্পের গাইডলাইন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। কিন্তু প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অনুরোধের প্রেক্ষিতে প্রকল্পটি একনেকে উপস্থাপনের সুপারিশ করেছে কমিশন।

এ প্রকল্পের প্রস্তাবটি উন্নয়ন প্রকল্পের বিদ্যমান পরিপত্র ও নির্ধারিত ছক অনুসরণ করা হয়নি। তাই উক্ত প্রস্তাব অনুমোদন বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রীর নিকট সারসংক্ষেপ প্রেরণ করা হলে তিনি সরকারী খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন পদ্ধতি অনুসরণ করে উন্নয়ন প্রকল্পের ছকে যথাযথভাবে ডিপিপি প্রণয়নের জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে পত্র দেয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। পত্র প্রদানের পর প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী একটি ডিও লেটারের মাধ্যমে উলিস্নখিত প্রকল্পের ডিপিপির ধরন ও আঙ্গিক নিশ্চিত করার জন্য পরিকল্পনামন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি সভা আহ্বানের অনুরোধ করেন। সে অনুযায়ী গত ২১ এপ্রিল পরিকল্পনা কমিশনে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিদ্যমান পরিপত্র অনুসরণ করে প্রকল্পটি প্রক্রিয়াকরণের বিষয়ে মত প্রকাশ করা হয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় গত ২০ ও ২৫ এপ্রিল এ প্রকল্পের নেগোশিয়েশনের জন্য ইআরডি হতে দুটি পত্র পায়। এতে উলেস্নখ করা হয় যে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে নেগোসিয়েশনের পূর্বে পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা জরুরী। কারণ সেই সভার সুপারিশকৃত ডিপিপির ভিত্তিতেই ঋণ নেগোসিয়েশন হবে। তাই বিদ্যমান পরিপত্র ও পদ্ধতির সঙ্গে যেসব অসঙ্গতি রয়েছে তা বিস্তারিতভাবে আলোচনাপূর্বক বিদ্যমান পরিপত্র অনুসারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে এ শর্তে পরিকল্পনামন্ত্রীর সম্মতি গ্রহণ করা হয় এবং গত ৯ মে পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মন্ত্রণালয় হতে নির্ধারিত ছকে ডিপিপি প্রণয়ন করে পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করা হয়। গত ১৬ জুন এ প্রকল্পের ওপর পুনরায় পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভায় আলোচনা হয় যেন উন্নয়ন প্রকল্পের নির্ধারিত ছকে প্রস্তাব করা হলেও উন্নয়ন প্রকল্পের গাইডলাইন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এ প্রকল্পের অর্থায়ন ব্যবস্থায় উন্নয়ন সহযোগীরা সংযুক্ত তহবিলে অর্থপ্রদান করবে এবং উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থের ৫৭ শতাংশ অনুন্নয়ন খাতে এবং ৪৩ শতাংশ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ প্রদান করা হবে। উন্নয়ন খাতের প্রদত্ত অর্থ সংযুক্ত তহবিলে রাখা হবে। অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায়ও উন্নয়ন প্রকল্পের বিদ্যমান পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে না। অর্থছাড় হবে রাজস্ব বাজেটের আওতায় বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ার মতোই। এছাড়া অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন উভয় বাজেটের জন্য উন্নয়ন সহযোগীরা অর্থ ছাড়ে মোট ৯টি ডিসবাজমেন্ট লিংক ইন্ডিকেটর নির্ধারণ করেছে। উক্ত ৯টি নির্দেশকের মধ্যে কোন বছর যদি একটি নির্দেশক কাঙ্খিত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হয় তাহলে সে বছর প্রকল্প সাহায্যের কোন অর্থ ছাড় হবে না। কিন্তু বিদ্যমান পদ্ধতি অনুযায়ী উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়ন একটি বিশেষায়িত এ্যাকাউন্টে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে জমা হয়। বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দের ভিত্তিতে মোট চার কিসত্মিতে অর্থ অবমুক্ত করা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার অনুকূলে অর্থ অবমুক্তির সরকারী মঞ্জুরি আদেশ জারি করে। তবে মধ্যমেয়াদী বাজেট কাঠামোর আওতায় প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ের পারফর্মেন্স ইন্ডকেটর নির্দিষ্ট করা আছে। এর মাধ্যমে মন্ত্রণালয়গুলোর কাজের অগ্রগতি নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এই নির্দেশকের সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগীদের দেয়া নির্দেশকের কোন সম্পর্ক নেই।

প্রকল্পটির বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ এবং আইএমইডি হতে মতামত দেয়া হয় যে পিইডিপি-৩ এর ডিপিপি উন্নয়ন প্রকল্পের বিদ্যমান পরিপত্র ও নির্ধারিত ছক অনুসরণ করা হয়নি এবং বিভিন্ন অঙ্গ ও অঙ্গভিত্তিক ব্যয় কোন যাচাই-বাছাই করা হয়নি। অনেক অঙ্গেও সুনির্দিষ্ট কোন বিবরণ ডিপিপিতে নেই। এগুলো আরও পরীক্ষা-নীরিক্ষা ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। তাই প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে প্রতিবছর বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা পূর্ববর্তী অর্থবছরের ৩০ জুনের মধ্যে পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের মাধ্যমে পরিকল্পনামন্ত্রী অথবা একনেকে অনুমোদন করা সমীচীন হবে। পিইসি সভার সিদ্ধান্ত মতে প্রকল্পের ডিপিপি পুনরায় পুনর্গঠন করে পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করা হয়। এই পুনর্গঠিত ডিপিপি পরীক্ষা করে দেখা যায় পিইসি সভার কিছু কিছু সিদ্ধানত্মের আলোকে ডিপিপি পুনর্গঠন করা হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়নি।

 

তারপরও পিইডিপি-২ জুন মাসে শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ১ জুলাই থেকে পিইডিপি-৩ কর্মসূচী চালু করার বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অনুরোধের প্রেক্ষিতে এ প্রকল্পটি একনেকে উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। জানা গেছে যে, এই ট্রেজারি মডেল বাস্তবায়ন হলে বর্তমান নিয়মের পরিবর্তে দাতারা তাদের প্রতিশ্রুত অর্থ ট্রেজারিতে জমা দেবে। সেখানে তারা প্রকল্পভিত্তিক টাকা না দিয়ে প্রোগ্রামভিত্তিক টাকা দেবে। যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি খাত ওয়ারী টাকা দেয়া হবে। সেখান থেকে তাদের দেয়া কিছু শর্ত মেনে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে অর্থ ব্যয় করা যাবে। এক্ষেত্রে টাকার কোন রং থাকবে না। অর্থাৎ উন্নয়ন ও রাজস্ব বাজেটের টাকা বলে আলাদা কিছু থাকবে না। কিন্তু দেশে যুগ যুগ ধরে চলে আসা নিয়ম হচ্ছে দাতারা যে কোন প্রকল্পে প্রকল্প সহায়তার (বৈদেশিক ঋণ বা অনুদান) অর্থ যে কোন বাণিজ্যিক ব্যাংকে প্রকল্পের এ্যাকাউন্টে জমা দেয়। সেখান থেকে অর্থ ব্যয় করা হয়। আর সরকারী অর্থের টাকা দেয়া হয় ট্রেজারিতে। এভাবে আলাদা করে অর্থ ব্যয় করা হয়। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ত্বরান্বিত হয় এবং দায়িত্ব কুক্ষিগত হয় না। দাতাদের চাপিয়ে দেয়া এ নিয়মটি একীভূত বাজেটেরই একটি অংশ এবং প্রথম ট্রায়াল হিসেবে মনে করা হচ্ছে।


Share with :

Facebook Twitter